স্টাফ রিপোর্টার, রাজবাড়ীঃ
নবনিযুক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলামের নির্দেশের পরও রাজবাড়ী জেলার পাঁচ থানায় কাজে যোগ দেননি পুলিশ সদস্যরা। এতে জেলায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ঘটছে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধ।
শনিবার (১০ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজবাড়ী সদর থানায় গিয়ে দেখা যায় সেখানে কোনো পুলিশ সদস্য নেই।
কয়েকজন সেনাবাহিনীর সদস্য ও আনসার সদস্য থানা পাহারা দিচ্ছেন। থানার সামনের গেটও বন্ধ রয়েছে। সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরেও থানায় ঢোকার অনুমতি দেননি সেনা সদস্যরা।
এ সময় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইফতেখারুল আলম প্রধানের সরকারি মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘থানার কার্যক্রম শুরু হয়নি। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অফিসার-ফোর্সরা থানায় আসার সাহস পাচ্ছেন না।’
এছাড়া পাংশা, কালুখালী, বালিয়াকান্দি ও গোয়ালন্দঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ কর হলে তারা জানান, তাদের থানার কার্যক্রম শুরু হয়নি। কবে নাগাদ শুরু হবে তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি তারা।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশে আরও অরাজকতা তৈরি হবে। দ্রুত এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে দেশে অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে অনেক পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার সদস্য। গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন। ওই দিন বিকেলের পর থেকে দেশের বেশির ভাগ থানার পুলিশসহ বিভিন্ন ইউনিটের পুলিশ সদস্যরা কর্মবিরতিতে চলে যান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ ইউনিটের কর্মকর্তা ও ফোর্সকে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যে কর্মস্থলে যোগদানের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত রাজবাড়ী জেলার কোনো থানায় পুলিশ যোগ দেননি।
এদিকে, ১১ দফা দাবি জানিয়ে গতকাল শুক্রবার জেলা পুলিশ লাইন্সে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন জেলার পুলিশ সদস্যরা। পরিস্থিতির জন্য দোষী পুলিশের শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন তারা।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বিগত ১৫ বছরে অধস্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিসিএস পুলিশ অফিসারদের বিভিন্ন অন্যায়ের কথা তুলে ধরে তাদের শাস্তি দাবি করেন। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তার দাবি জানান তারা। ১১ দফা পূরণ না হওয়া অবধি ও পুলিশে সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত কাজে ফিরবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
এ সময় তারা, আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না; আমার ভাই মরলো কেন, জবাব চাই জবাব চাই; এবং পুলিশে সংস্কার, এই মুহূর্তে দরকার ও পুলিশ হবে জনতার যদি হয় সংস্কার- ইত্যাদি স্লোগান দেন।
বিক্ষোভে কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও কতিপয় দালালের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে আমাদের পুলিশ সদস্যরা ছাত্রদের ওপর গুলি করতে বাধ্য হয়। তাদের নির্দেশ পালন না করলে আমাদের চাকরি খেয়ে নিতো তারা। এই আন্দোলনে আমাদের অনেক পুলিশ সদস্যের ওপর নির্যাতন হয়েছে; যা মধ্যযুগীয় নির্যাতনকে হার মানিয়েছে। আমরা দেশবাসীর শত্রু হতে চাই না। আমরা জনগণের বন্ধু হতে চাই। আমরা তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের হয়ে কাজ করতে চাই। রাজনৈতিক মন্ত্রী-এমপিদের কাছ থেকে সুবিধা পেয়ে অনেক দালাল পুলিশ অফিসার আমাদের যেমন খুশি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করেছে। আমরা আর এসব দলাদলিতে থাকতে চাই না।
এ সময় অধস্তন পুলিশ সদস্যদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার জি. এম. আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘তোমাদের সামনে দাঁড়ানোর মতো সৎ সাহস আমার নেই। এ আন্দোলনের সময় তোমাদের যে ভাইরা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যেভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে এগুলো কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব কি না আমার জানা নেই। নিশ্চয়ই তোমাদের দাবিদাওয়া সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করবো, নিশ্চয় ভালো একটা ব্যবস্থা হবে। আমি তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি।’







