সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

দিনাজপুরে পালিত হলো মহান সান্তাল বিদ্রোহ দিবস

নিউজ ডেস্কঃ ৩০ জুন ২০২৪, দিনাজপুরের, রতনপুরে, জবচ গীর্জা প্রাঙ্গণে প্রতি বছরের ন্যায় এইবার পালিত হলো মহান সান্তাল বিদ্রোহ দিবস। অনুষ্ঠানটি আয়োজনে অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে ফ্রেন্ডশীপ যুব সংগঠন। যেখানে সভাপতিত্ব করেন ৩ নং খানপুর ইউনিয়ন পারগানা পরিষদ এর সভাপতি সামুয়েল মার্ডী।

সকালে গীর্জার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। তারপর সবাই মিলে। রেলী করে সান্তাল বিদ্রোহ স্মৃতি স্তম্ভে ফুলের মালা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করা হয়৷ গ্রামের গ্রাম প্রধান ও তার পাশাপাশি গ্রামের সবাই পুষ্প অর্পন করেন।এর পর শুরু হয় আলোচনা সভা৷ যেখানে আমন্ত্রিত অতিথি বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেএই আলোচনা পর্বে শেষে সাংস্কৃতিক অনিষ্ঠান হয় যেখানে এলাকার ছেলেমেয়েরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী নাচ প্রদর্শন করে। তা ছাড়া ভারত থেকে আগত আদীবাসী সংগীত শিল্পি সান্তাল ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবেশন করে। এ অনুষ্ঠানে সবাই সান্তাল ঐতিহ্যবাহী পোষাক পরিধান করে।

সান্তাল বিদ্রোহের ইতিহাস সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়,

সান্তাল বিদ্রোহ শুরু হয় সিঁধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর নেতৃত্বে ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে।বিদ্রোহের ইতিহাস জানতে হলে প্রথমত জানতে হবে, সান্তাল কারা?
সান্তালরা ভারতবর্ষের আদিম আদিবাসী সম্প্রদায়।কঠোর পরিশ্রমী,শান্তিপ্রিয়,সরলপ্রকৃতির কৃষিজীবী আদিবাসী সম্প্রদায়।কৃষিকাজই সান্তালদের প্রধান ও মূখ্য জীবিকা ছিল।
প্রাথমিকভাবে সান্তালরা বাস করতো বাংলার বাকুড়া, মেদিনীপুর, বীরভূম, মানভূম,ছোটনাগপুরের পালামৌ অঞ্চলের গভীর অরণ্যে।মূখ্যকাজ ছিল কৃষিকাজ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বনাঞ্চলে যাদের স্বাভাবিক অধিকার ছিল।সেই বন থেকে ফল,মূল,কাঠ ও শিকার করে তাঁরা তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করতো।গোল বাধলো যখন ১৭৯৩ সালের ২২ শে মার্চ লর্ড কর্নওয়ালিসিস ভারতবর্ষে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন।এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমির অধিকারটা চলে গেল জমিদার, ইজারাদারদের কাছে এবং তারা বংশ পরম্পরায় জমির ওপর অধিকার ভোগ করতে শুরু করল।ফলে যারা কৃষিকাজ করতো জমির ওপর অধিকার আর তাঁদের থাকলো না।তাঁরা ভূমিদাসে পরিণত হল।কিন্তু ভারতবর্ষের ইতিহাসে যাঁরা কখন ট্যাক্স দেয় নি, বনের ওপর যাদের স্বাভাবিক অধিকার ছিল সেই সান্তালদের ওপর জমিদাররা উচ্চহারে ট্যাক্স বসাতে শুরু করে।কখন জমিদারদের উচ্চহারের ট্যাক্স,কোম্পানির কর্মচারীর অত্যাচারে এতটাই অতিষ্ঠ হয়ে বাকুড়া, মেদিনীপুর, বীরভূম, মানভূম,ছোটনাগপুরের পালামৌ থেকে ঝাড়খণ্ড, বিহার এর রাজমহল পাহাড়ের আরো দূর্গম পার্বত্য অঞ্চলে তাঁরা বসবাস শুরু করে।

গহীন অরণ্য যেখানে কোনো মানুষের হাত পড়েনি সেখানে গাছপালা কেটে কৃষিজমি তৈরি করে।সান্তালরা এই জায়গাটির নাম দিল ❝দামিনইকোহী❞।দামিনইকোহী একটি সান্তাল শব্দ, যার অর্থ পাহাড়ের প্রান্তদেশ।পরবর্তীতে ❝দামিনইকোহী❞ শব্দটিকে পলিটিক্যাল ভাবে ব্যবহার করা হয় ❝ট্যাক্স ফ্রি ল্যান্ড ফর সান্তাল❞।সেখানে তাঁরা শান্তিতে বসবাস শুরু করে কৃষি কাজে মন দেয়।যেহেতু গহীন অরণ্য, অরণ্যে তাঁদের স্বাভাবিক অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়।কিন্তু সেখানেও তাঁরা বহিরাগতদের হাত থেকে রেহাই পেল না।ক্রমশ জমিদার, ইজারাদার, মহাজন, শস্যবিক্রেতা,মধ্যস্বত্বভোগী এই সমস্ত বহিরাগতরা দামিনইকোহীতে প্রবেশ করতে শুরু করে।সান্তালদের ভাষায় যাদের দিকু বলা হয় । যার অর্থ প্রবঞ্চক,ঠক।কিন্তু সান্তালরা শব্দটি বহিরাগতদের উদ্দেশ্য ব্যবহার করতো,যারা দামিনইকোহীতে প্রবেশ করেছে।এই দিকুর মধ্যে জমিদার,ইজারাদার, শস্যব্যবসায়ী, নীলকর,ইংরেজ কর্মচারী,রেলকর্মচারী,সিপাহী অর্থ্যাৎ যারা অবাঞ্ছিত ভাবে দামিনইকোহীতে ঢুকে পড়েছিল তারা দিকু।এই দিকুদের হাত থেকে তাঁদের আর নিস্তার রইল না।ছোটনাগপুর বীরভূম থেকে সরে এসে রাজমহলের প্রান্তদেশেও শান্তিতে থাকা হলো না,উচ্চহারের ট্যাক্স থেকে ও মুক্তি পেলনা। সেই দামিনইকোহীতেও ইংরেজ, জমিদাররা উচ্চহারে ট্যাক্স বসাতে শুরু করল। ট্যাক্স ফ্রী দামিনইকোহী সেখানেও সেই উচ্চহারে ট্যাক্স এটাই সান্তাল বিদ্রোহের সূত্রপাত।

সান্তাল বিদ্রোহের প্রধান ও মূখ্য কারণ ধরা হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।দামিনইকোহীতে জমিদারদের উচ্চহারে ট্যাক্স বসানো সান্তাল বিদ্রোহ ❝হুল❞ এর শুরু।শুধু একটা কারণে কখনো বিদ্রোহের আগুন জ্বলে না,আরো কারণ ছিল।বহুচাঁদ আগে বাপ ঠাকুরদাদারা দামিনইকোহীতে কোনো ট্যাক্স বসাতে দেয়নি সেখানে তাদের ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। দেশিয় মহাজনরা তাঁদের পিছু পিছু চলে এসেছে। মহাজন ১০০ টাকা ধার দিলে নিরক্ষর সান্তালদের কাছ থেকে ১০০০ টাকা লিখিয়ে নেয়।কখন ৫০% কখন ৫০০%সুদে টাকা দেয় এবং একবার ঋণ নিলে,সেই ঋণের ফাঁদ থেকে সারাজীবন বংশপরম্পরায় তাঁরা বের হতে পারতেন না।ফসল, বলদ,লাঙ্গল সব চলে যেত এমনকি নিজেরাও বিক্রি হয়ে যেত।তবুও এই মহাজনদের ঋণ শোধ হতো না।বেগার খাটানোর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেছিল। শস্যব্যবসায়ীরা শস্য কেনার সময় এক ধরনের বাটখারা ব্যবহার করতো আর বিক্রির সময় আর এক ধরনের বাটখারা ব্যবহার করতো।যাকে বলা বাংলা চলিত ভাষায়, কেনারাম ও বেচারাম বাটখারা বলা হয়।আবার বিদেশিদের প্রভাবে ধর্মের উপর,সমাজব্যবস্থা,রীতিনীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।এই সময় আবার ইংরেজ সৈন্য,রেল কর্মচারী,ঠিকাদার সান্তালদের হাঁস,মুরগী, ছাগল, এমনকি সান্তাল রমণীদের অপহরণ করে নিয়ে যেত।এসব সহ্য করতে না পেরে যখন ভেতর থেকে সমাজব্যবস্থা ফুসে উঠছে এবং সমাজের ভেতর থেকে সিঁধু ও কানু দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে জুন দামিনইকোহীর ভাগনাডিহি মাঠে ১০,০০০ সান্তাল একত্রিত হয়।

একটা উঁচু জায়গা থেকে সিঁধু বক্তৃতা দিতে শুরু করে।বহুচাঁদ আগে আমরা ছোটনাগপুর থেকে পালিয়ে এসেছি, এখন আমরা কোথায় পালিয়ে যাব! ঠাকুরদা (সান্তালরা যাকে পূজা করে) স্বপ্নে নির্দেশ দিয়েছে সান্তালদের জাগতে হবে, সান্তালদের হুল করতে হবে। হুল অর্থ সান্তালী ভাষায় ❝বিদ্রোহ❞।সিঁধুর এই আহ্বানে ১০,০০০ সান্তাল একত্রে গর্জে ওঠে হুল,হুল,হুল।যেটা ছিল সান্তালদের শেষ ও বিকল্প পথ।সিঁধু ঘোষণা করে তোমাদের যা আছে, তীর-ধনুক,বল্লম,দা,বটি,লাঠি তা নিয়ে দিকুদের মোকাবেলা করতে হবে। সান্তাল বিদ্রোহ ঘোষণার কারণ দামিনইকোহী থেকে দিকুদের চিরস্থায়ীভাবে বিতাড়িত করা এবং স্বাতন্ত্র্য সান্তাল রাজ প্রতিষ্ঠা করা।সিঁধু- কানু’র মতো চাদঁ মুর্মু ও ভৈরব মুর্মু নেতৃত্ব দেয়।আরও নেতৃত্ব দিয়ে ছিল বীর সিং,কালো প্রামাণিক,ডোমন মাঝি,ফুলো মুর্মু ও ঝানো মুর্মু।ক্রমশ তারা ৫০,০০০ এ উন্নিত হয়।জমিদারদের বাড়ি আক্রমণ করে,বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়,ইংরেজ থানা পুলিশদের সাথে যুদ্ধ করে,সকল কিছু তারা দখল করে।কয়েক মাসের মধ্যে তাঁরা বীরভূম, মহেশপুর, মুর্শিদাবাদ,সিংভূম,মুংগের,হাজারীবাগ,এদিকে রাজমহল থেকে কোলগঞ্জ,বীরভূম থেকে ভাগলপুর পর্যন্ত সান্তাল মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়।এই সান্তাল মুক্তাঞ্চল ইংরেজদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। ইংরেজ সেনাদল মুর্শিদাবাদের নবাবের সহযোগিতায় সান্তালদের দমন করতে শুরু করে।কারণ তাদের কোল বিদ্রোহ দমনের অভিজ্ঞতা ছিল। ইংরেজদের কামানের সামনে থেকে যুদ্ধ শুরু হয়।ইংরেজদের কামানের গুলিতে সিঁধু মৃত্যুবরণ করেন।কানু’র ফাঁসি হয়।২৩,০০০ সান্তালকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এছাড়াও ফুলো,,ঝানো এর মতো অনেক সাঁওতাল নারী এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে এবং নিজেদের জীবন দান করেন।

 

/বদরুল ইসলাম জামিল

সম্পর্কিত