নিজস্ব প্রতিনিধি:কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার বিল নিয়ে আদালতের নির্দেশনা ও বাস্তবায়ন শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার(১২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০ টায় রাজারহাট উপজেলা পরিষদ ডাক বাংলোর হল রুমে বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আইনজীবী সমিতি(বেলা)র আয়োজনে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পরিবেশবাদী আইনজীবী সমিতি বেলার উত্তরাঞ্চল সমন্বয়ক তন্ময় কুমার স্যান্যাল সঞ্চালনায় রাজারহাট উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হৈমন্তী রাণী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর(এলজিইডি)র উপজেলা প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা, বেলার আইনজীবি আসাদুল্লাহ আল গালিব ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভায় উপজেলার চাকিরপশার বিল এলাকার প্রায় শতাধিক কৃষক অংশ নেন।
এসময় চাকিরপশার বিল পাড়ের বাসিন্দারা চাকিরপশার বিলকে নদী হিসাবে দাবী করেন এবং ওই নদীর সাথে কাটানো তাদের শৈশব স্মৃতি চারণ করেন। একটি নদীর উপরে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ ও রাষ্ট্র কিভাবে আড়াআড়ি সড়ক করে নদীকে হত্যা করেছে। পরে নদী দখল করে পুকুর নির্মাণ ও প্রাকৃতিক জলাধারকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিনত করেছে সেসব কথা জানান।
বোতলা গ্রামের স্থানীয় কৃষক মোস্তফা জামান লেলিন জানান, চাকিরপশার একটি নদী। এই নদীতে আড়াআড়ি সড়ক করে, নদীর জায়গা দখল করে কিছু প্রভাবশালী মহল বিল ও খালে পরিনত করেছে। নদীর ওপর দিয়ে আড়াআড়ি সড়ক করায় নদীর পানি প্রবাহিত হতে পারে না। ফলে প্রতিবছর প্রায় কয়েক শত বিঘা জমির ফসল জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তার নামে দুইটি মামলা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
চাকিরপশার বিল এলাকার কৃষক নজির হোসেন বলেন, একসময় এই চাকিরপশার নদী দিয়ে নৌকা যাইতো। এই নদীতে নৌকা বাইচ হইতো। এখানে জাল ফেলে শতশত জেলে জীবিকা নির্বাহ করতো। আর এখন ভূমি দখলদাররা নদীকে দখল করে এখানে বড় বড় পুকুর বানিয়েছে। তাদের ভয়ে জেলে তো দূরের কথা, স্থানীয় লোকজন গোসল করতে নামতেও ভয় পায়।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা জানান, চাকিরপশার পাঠানহাট নামক স্থানে কৈলাসকুঠি যাওয়ার চাকিরপশার বিলের উপর আড়াআড়ি রাস্তা কেটে দিয়ে সেখানে একটি সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দ্রুত সেখানে একটি সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হবে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হৈমন্তী রাণী বলেন, চাকিরপশার বিলের পানি প্রবাহ ঠিকভাবে যাতে প্রবাহিত হতে পারে। কৃষকরা যাতে তাদের ফসল সঠিকভাবে চাষাবাদ করতে পারে সে বিষয়ে আমরা সজাগ রয়েছি।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে রিভারাইন পিপলের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনসহ যতগুলো ভূমি বিষয়ক, পরিবেশ বিষয়ক আইন হয়েছে তার কোনটিতেই নদী, খাল, বিল, বনভূমি এগুলো কোনভাবেই ব্যক্তি নামে হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সারা দেশে সেটি হচ্ছে। এই সুযোগ করে দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আমরা রিভারাইন পিপলের নদী কর্মীরা, পরিবেশ কর্মীরা যখন এই আইন ও দখলদারদের বিষয়ে তথ্য নিয়ে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনের কাছে, ভূমি অফিসের কাছে যাই তখন তারা বিরক্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রিয় সম্পত্তি নদী, জলাশয়, বিলের রেকর্ড সংশোধন করে দখলদারদের নামে যারা লিখে দিয়েছে। যারা একসময় এই উপজেলার এসিল্যান্ড ছিলেন, যারা তফসিলদার ছিলেন, যারা ওই সময়ে এই উপজেলার ইউএনও ছিলেন তারা এখন কোন না কোন জেলার ডিসি এবং সচিব হয়েছেন। তাদের ধরে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একটি নদীর জমি তারা রেকর্ড সংশোধন করে ব্যক্তির নামে দিবে আর তার সেই কর্মের ফল সাধারণ জনগণ ভোগ করবে এটা হতে দেওয়া যাবে না।
উল্লেখ্য যে, কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা শহরের কোলঘেঁষে প্রবাহমান ছিল চাকিরপশার নদী। হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে (১৯৮৫-১৯৯০) জেলার উলিপুর উপজেলার এ কে এম মাঈদুল ইসলাম ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। রাজারহাটের কৈলাশকুটি গ্রামে তাঁর আত্নীয় মীর ইসমাইল হোসেন পরিবারের চলাচলের জন্য জলমহল ব্যবস্থাপনা আইন লঙ্গন করে চাকিরপশার নদীর ওপর দিয়ে আড়াআড়ি সড়ক নির্মাণ করেন। ফলে নদীটির প্রবাহ বন্ধ হয়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ একর জমি অনাবাদী হয়ে পড়েছে। ২০২০ সালে জেলা প্রশাসন চাকিরপশার নদীর ২২ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা করেন এবং ২০২৩ সালে অবৈধ দখলদারের নামে ১২৯টি মামলা করেন।










