আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে গ্রীন ভয়েস এর নারী ও শিশু অধিকার বিষয়ক উপটিম বহ্নিশিখার উদ্যোগে ২৪ এর চেতনায় নারীর অধিকার-সমতা ও ক্ষমতায়ন শীর্ষক আলোচনা সভা ও র্যালী অনুষ্ঠিত হয়েছে ।
বহ্নিশিখার কেন্দ্রীয় সংগঠক মোনছেফা তৃপ্তির সভাপতিত্বে এবং বহ্নিশিখা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, সংগঠক, ফাতেহা শারমিন এ্যানির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন, নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শারমিন্ড নিলোর্মী ডালিয়া, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, সিনিয়র সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া, গ্রীন ভয়েস এর প্রধান সমন্বয়ক মোঃ আলমগীর কবির, গ্রীন ভয়েস এর কেন্দ্রীয় সহ- সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির সুমন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চেমন ফারিয়া মেঘলা, কুররাতুল আইন কানিজ, প্রাপ্তি তাপসী আরো বক্তব্য রাখেন ঐশী নাথ, সংগঠক, বহ্নিশিখা, শামসুন্নাহার হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জান্নাত শাহরিন নিরা, সংগঠক, বহ্নিশিখা, সুফিয়া কামাল হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মারজান আফরিন শিলা, সংগঠক, বহ্নিশিখা, রোকেয়া হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জান্নাতুল ফেরদৌসী, সংগঠক, বহ্নিশিখা, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, অধরা মিষ্টি, সংগঠক, বহ্নিশিখা, সরকারি বাঙলা কলেজ, আসমা সাদিয়া, সংগঠক, বহ্নিশিখা, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, মাওয়ংশোয়ে মারমা সমাপ্তি, সংগঠক, বহ্নিশিখা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, শাহরিন সেজুতি, সংগঠক, বহ্নিশিখা, তেজগাঁও কলেজ, নুসরাত ইমরোজ তিষা, সংগঠক, বহ্নিশিখা, ইডেন মহিলা কলেজ, আসফিয়া তাসনিম, সংগঠক, বহ্নিশিখা, বেগম বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ, নুসরাত করিম দিবা, সংগঠক, বহ্নিশিখা, লালমাটিয়া মহিলা কলেজ, প্ৰজ্ঞা পারমিতা, সংগঠক, বহ্নিশিখা, স্টেট ইউনিভার্সিটি। এই অনুষ্ঠানে প্রায় ৭ শতাধিক নারী শিক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করেন এবং তাদের দাবি ও ঘোষণা পত্র পাঠ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন নারী সংগঠন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গ্রীন ভয়েস এর কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন ইউনিটের নেতৃবৃন্দ পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
স্বাগত বক্তব্যে আলমগীর কবির বলেন, প্রতি বছর নানান প্রতিপাদ্য নিয়ে নারী দিবস উৎযাপন করা হয় কিন্তু পরিতাপের বিষয় নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা ও বৈষম্য বেড়েই যাচ্ছে। নারী ও শিশু এখন অনেক বেশি অনিরাপদ। তিন বছরের আছিয়াও আজ নিরাপদ নয় ধর্ষকদের হাত থেকে। নারীদের ন্যায্যতার বিষয়ে আর ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শারমিন্ড নিলোর্মী ডালিয়া বলেন, যেই বৈষম্য নিরসন করার জন্য জুলাই বিপ্লব হলো আজও সেই বৈষম্য থেকে আমরা আজও বেরিয়ে আসতে পারিনি। শিশু, নারী, পাহাড়ি সবাই আজও বৈষম্যের শিকার।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, আজ নদী ও নারী অনেক বেশি নিগৃহীত।
২৪ এর চেতনায় নারীর অধিকার-সমতা ও ক্ষমতায়ন শীর্ষক আলোচনা সভায় ঘোষণা পত্র পাঠ করেন বহ্নিশিখার কেন্দ্রীয় সংগঠন ফাহমিদা নাজনীন।
বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, আমরা, বহ্নিশিখা, নিম্নলিখিত দাবিসমূহ উত্থাপন করছি:
১. নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা:
১. নারী ও শিশুসহ সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
২. ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ এর সঠিক প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধীরা শাস্তি পায় এবং ভিকটিমরা ন্যায়বিচার পায়।
৩. ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এবং বাদীর ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে জবানবন্দি গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে, কোনোভাবেই বাদীকে জনসম্মুখে হেনস্তা করা যাবে না।
৪. নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কমিশন গঠন করতে হবে।
২. শিক্ষা ও সচেতনতা:
৬. নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
৭. স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষামূলক কার্যক্রম ও কর্মশালার আয়োজন করে নারীর অধিকার ও সম্মান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
৮. নারীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আত্মরক্ষার কৌশলসহ নানা জীবনমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৯. নারীর সমস্যা কে শুধু নারীর সমস্যা বলে চিহ্নিত না করে সমাজের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা এবং এসব সমস্যা সমাধানে বেশি বেশি পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করা।
১০. প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. স্বাস্থ্য ও প্রজনন সেবা:
১১. দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) স্থাপন করে নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
১২. বাজার, শপিং মল, শহরে নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট এবং সুলভ মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ প্রয়োজনীয় সকল সুরক্ষা সামগ্রী সহজলভ্য করতে হবে।
১৩. স্যানিটারি ন্যাপকিন/প্যাডে সরকারি ভর্তুকি বাড়াতে হবে এবং স্বাস্থ্যকর স্যানিটারি ন্যাপকিন/প্যাড সহজলভ্য করতে হবে।
১৪. কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীদের পিরিয়ডকালীন ছুটি নিশ্চিত করতে হবে।
১৫. সকল হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীদের বিনামূল্যে মাসিক স্বাস্থসেবা প্রদান করা।
৪. কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ:
১৬. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যকর কমিটি গঠন ও নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে নারীরা নিরাপদে শিক্ষা ও কর্মজীবন চালিয়ে যেতে পারেন।
১৭. দেশের সকল কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাতৃকালীন সুরক্ষা ও ছুটি, ডে কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. পরিবহন ও গণপরিসরে নিরাপত্তা:
১৮. নারীদের জন্য নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে এবং নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
১৯. অনলাইন ও অফলাইনে, যেকোনো অবস্থানে নারীর প্রতি হওয়া সকল প্রকার হয়রানি, বুলিং, টিজিং বন্ধ করতে হবে এবং এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতামূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে।
২০. নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সমাজের সকল স্তরে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যাতে নির্যাতিত নারীরা ভয় ও লজ্জা কাটিয়ে সহায়তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য এগিয়ে আসতে পারেন।
৬. আইন সংস্কার ও ন্যায়বিচার:
২১. নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের যুগোপযোগী সংস্কার ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
২২. পারিবারিক আইনে সমতা আনতে হবে এবং বৈষম্যমূলক প্রথা, যেমন বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত সালিশি কার্যক্রম ও বহুবিবাহ বন্ধ করতে হবে।
২৩. নির্যাতনের শিকার নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি, তাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২৪. পারিবারিক আইনে সমতা আনা ও বৈষম্যমূলক প্রথা (যেমন: বাল্যবিবাহ, যৌতুক, বহুবিবাহ) নিষিদ্ধ করা।
২৫. ১০৯২১ হেল্পলাইন সেবার প্রচারণা বৃদ্ধি করে নির্যাতিত নারীদের তাৎক্ষণিক সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
২৬. জাতিসংঘের সিডও সনদের অনুচ্ছেদ ২ ও ১৬(১) (গ) এর উপর হতে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে।










