মোঃমকবুলার রহমান:ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—আগামী শনিবারের (নির্ধারিত সময় অনুযায়ী) মধ্যে হামাস যদি জিম্মিদের মুক্তি না দেয়, তবে যুদ্ধবিরতি সমাপ্ত হবে এবং ইসরায়েল নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করবে। এই সতর্কবার্তার পরপরই তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)-কে গাজা উপত্যকার ভেতরে ও বাইরে পুনরায় সমাবেশ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
জিম্মি মুক্তির জটিলতা:
হামাস পূর্বে সম্মত হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার দাবি করলেও, ইসরায়েল বলছে তারা প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করছে। নির্ধারিত সময়ে তিনজন জিম্মি মুক্তি না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মধ্যেও কিছুটা বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে—নেতানিয়াহু কী সকল জিম্মির মুক্তি দাবি করছেন, নাকি কেবল শনিবারের তিনজনকে, সে বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারতেজ জানিয়েছে, নির্ধারিত তিনজন জিম্মি মুক্তি পেলেই যুদ্ধবিরতি বহাল রাখতে ইসরায়েল প্রস্তুত। কিন্তু ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্য মিরি রেগেভ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আমরা ট্রাম্পের প্রস্তাবকে সমর্থন করছি—শনিবার সবাই মুক্তি পাবে!”
ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি ইসরায়েলকে পরামর্শ দিয়েছেন, শনিবারের মধ্যে সব জিম্মি মুক্তি না পেলে চুক্তি বাতিল করতে। নেতানিয়াহু তার বিবৃতিতে ট্রাম্পের অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং বলেছেন, “হামাসের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছি—যদি শনিবারের মধ্যে জিম্মিরা মুক্তি না পায়, তবে আইডিএফ পূর্ণমাত্রার লড়াই শুরু করবে এবং হামাসকে পরাজিত না করা পর্যন্ত তা চলবে।”
হামাস ট্রাম্পের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছে এবং বলেছে এটি “জাতিগত নিধনের প্রচেষ্টা।” ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষসহ বেশ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রও ট্রাম্পের মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসংঘ এই পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও বর্তমান অবস্থা:
মূল চুক্তি অনুযায়ী, ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ৩৩ জন ইসরায়েলি জিম্মির মুক্তির বিনিময়ে ১,৯০০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল। এখন পর্যন্ত ১৬ জন জিম্মি মুক্তি পেয়েছে এবং অতিরিক্ত পাঁচজন থাই নাগরিককেও ছেড়ে দিয়েছে হামাস।
হামাসের দাবি, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভাঙতে চায় না এবং যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে। হামাস নেতা বাসেম নাইম বলেছেন, “আমরা বাধা ও চ্যালেঞ্জ এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। যদি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরিস্থিতির সংশোধন হয়, তবে আমরা শনিবার বন্দিদের হস্তান্তরে প্রস্তুত আছি।”
অন্যদিকে, ইসরায়েল হামাসের বিরুদ্ধে গাজার উত্তরাঞ্চলে মানুষ ফেরার অনুমতি দিতে দেরি করা, মানবিক সহায়তায় বাধা দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি:
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৪৮,১২০ জন নিহত হয়েছেন। গাজার জনসংখ্যার বিশাল অংশই বারবার স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছে, এবং অঞ্চলটির প্রায় ৭০% অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। খাদ্য, চিকিৎসা, পানি ও আশ্রয়ের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
পরবর্তী ধাপে কী ঘটতে পারে?:
নেতানিয়াহুর আল্টিমেটামের কারণে শনিবার গুরুত্বপূর্ণ এক মোড় নিতে যাচ্ছে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হামাস জিম্মি মুক্তি না দেয়, তাহলে ইসরায়েল গাজায় পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে। ফলে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বস্তুত, এই সংকট কেবল ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার লড়াই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।







