মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী:
রাজবাড়ী বালিয়াকান্দি উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলে চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে উন্নত জাতের সরিষা চাষ হয়েছে। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠজুড়ে বিছানো রয়েছে যেন হলুদের গালিচা। সরিষার বেড়ে ওঠা গাছ আর ফুল দেখে অধিক ফলনের স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা। গত বছর স্থানীয় বাজারে উন্নত জাতের সরিষার চাহিদা ও দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা এবার সরিষা চাষে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ব্যস্ততা বেড়েছে মৌ চাষিদের মধু সংগ্রহে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে প্রত্যেক সরিষা চাষি অধিক লাভবান হবেন বলে মনে করছেন উপজেলা কৃষি বিভাগ।
বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় চলতি মৌসুমে সরিষার লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে কিন্তু আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে। তবে আরও বেশ কিছু জমিতে বিভিন্ন জাতের সরিষার আবাদ হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরিষার আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং অচিরেই ভোজ্য তেল আমদানি করা বাদেই সরিষা থেকে দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। এমনকি এ উপজেলার ভোজ্য তেলের চাহিদা মিটিয়ে অন্য উপজেলাতে রফতানি করা সম্ভব হবে।
বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১০৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। গাছে ফল আসার পর উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। সিংহভাগই কৃষকরা জমিতে উচ্চ ফলনশীল বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা -১৮ ও বিনা-১৭ জাতের সরিষা চাষ করছেন। চলতি মৌসুমের শুরুতে উপজেলা কৃষি বিভাগ অধিক ফলনশীল বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা ১৮ ও বিনা সরিষা-১৭ জাতের সরিষা এবং রাই চাষে কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করেন। এ তিনটি জাতের সরিষা মাত্র ৭০-৭৫ দিনে কৃষকের ঘরে তোলা যায়। প্রতি হেক্টরে বারি সরিষা-১৪ জাত ১.৪১৬ টন ও বিনা সরিষা-১৭ জাতের ফলন হয় ০.৯৫১ টন, রাবি সরিষা -১৮ জাত ফলন হয় ১,৩৪৫ টন। সরিষা কেটে ওই জমিতে আবার ভালোভাবেই বোরো ধান আবাদ করা যায়।
বালিয়াকান্দি উপজেলার বাড়াদী গ্রামের চাষি মোঃ আব্দুস সাত্তার খান এর সাথে কথা বলে জানা যায়, সরিষা লাভজনক একটি ফসল। সরিষা চাষে আর্থিক খরচ ও শ্রম দু’টিই কম লাগে। তাছাড়া গত বছর সরিষার নায্যমূল্য পাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকরা এবার ব্যাপকভাবে সরিষা চাষ করেছেন।
সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, বালিয়াকান্দি উপজেলার নতুনচর ফসলের মাঠগুলো সরিষা ফুলের হলুদ রঙে অপরুপ শোভা ধারণ করেছে। এটা দেখে মনে হচ্ছে যেন হলুদের গালিচা বিছানো রয়েছে মাঠের বুকজুড়ে। ইতোমধ্যে কোন কোন জমিতে তাজা সরিষা ফুল, কোন জমিতে ফুল ঝরতে শুরু করেছে, কোন জমির গাছগুলোতে আবার সরিষার দানা বাঁধতে শুরু করেছে। প্রতিটি জমিতেই তরতাজা সবুজ সরিষা গাছগুলোতে হলুদ ফুলে ফুলে ভরে ওঠায় কৃষকের মুখে সুন্দর হাসি ফুটতে শুরু করেছে।
বহরপুরের চাষী আব্দুল বারি বলেন, এ বছর ২ বিঘা জমিতে বারি সরিষা-১৮ জাতের সরিষার আবাদ করেছি। বিঘা প্রতি ৩-৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি ফলন ভালো হবে। শুরু থেকেই কৃষি অফিস নানা উপকরণসহ পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। কৃষি উপ -সহকারীগণ মাঠে এসে কৃষকের সাথে থেকে রোগ বালাই বিষয়ে সঠিক পরামর্শ প্রদান করেন। যার প্রেক্ষিতে আমরা ফসলের ভালো ফলন পাই।
একই এলাকার চাষী মুনছুর আলী জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ৪ বিঘা জমিতে বারি সরিষা-১৪ জাতের উচ্চ ফলনশীল সরিষা চাষ করেছেন। যা থেকে তিনি ৩০ মণ সরিষা পাবেন বলে আশা করছেন। বর্তমানে প্রতিমণ সরিষা ৩০০০-৩৫০০ টাকা দরে ক্রয় বিক্রয় হচ্ছে। তিনি আরও জানান, গত বছর ৩ বিঘা জমিতে খরচ খরচা বাদে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিলো।
ইসলামপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের চাষী শামীম আহমেদ জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ৩ বিঘা জমি ভাগ করে দুইটি প্লটে বারি সরিষা-১৪ ও বারি সরিষা -১৮ জাতের উচ্চ ফলনশীল সরিষা চাষ করেছি। এতে ফলন ভালো পাবো বলে আশা করছি। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে সরিষা চাষে অধিক লাভ হবে বলে মনে করছি।
জঙ্গল ইউনিয়নের অলংকারপুর গ্রামের চাষি ফিরোজ রহমান এর সাথে কথা বলে জানা যায়, সরিষা লাভজনক ফসল। সরিষা চাষে আর্থিক খরচ ও শ্রম দু’টিই কম লাগে। তাছাড়া গত বছর সরিষার নায্যমূল্য পাওয়ায় এবারও সরিষা চাষ করেছি।
নবাবপুর ইউনিয়নের গাংচর পদমদী গ্রামের চাষি আতাউর রহমান জানান, আমি প্রতি বছর সরিষা চাষ করি কারণ সরিষা থেকে যে তৈল পাই তা নিজের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রী করে থাকি। আর সরিষা হলো লাভজনক ফসল। এতে আর্থিক খরচ ও শ্রম কম লাগে।
এ ব্যাপারে বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর ভোজ্যতেল আমদানির পেছনে যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় তা কমিয়ে আনতে কৃষকদের সরিষার আবাদ বৃদ্ধির জন্য প্রতিনিয়ত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। উন্নতজাতের সরিষা চাষে কৃষকদের মাঝে মাঝে প্রণোদনার মাধ্যমে উপকরণ সহায়তাসহ নানা পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে। তাছাড়া তেল জাতীয় প্রকল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের প্রদর্শনী দেয়া হচ্ছে ফলে কৃষকরা সরিষা চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে অনেক কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে সরিষার বীজ ও সার প্রদান করেছি।
তিনি আরও জানান, এ জমিতে শুধু সরিষায় নয় কিভাবে বোরো ও আমন ধান চাষের জন্য কি জাত ব্যবহার করা যায় পাশাপাশি অন্যান্য ফসলও চাষাবাদ করা যায় সে বিষয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে আসছে। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে সরিষার আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং অচিরেই ভোজ্য তেল আমদানি করা বাদেই সরিষা থেকে দেশের মধ্যে তেলের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।










