রাজবাড়ী প্রতিনিধি ঃ
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার আস্তানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ‘তৌহিদি জনতা’ ও আস্তানার লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশত। নিজেকে ‘ইমাম মাহাদি’ দাবি করা নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে সেনাবাহিনী ও র্যাব ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
জানা গেছে, শুক্রবার (০৫ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর গোয়ালন্দ উপজেলা আনসার ক্লাব চত্বরে এলাকার ‘তৌহিদি জনতা’ একত্রিত হয়। পরে তারা নুরাল পাগলার আস্তানায় হামলা করে। এ সময় পুলিশের দুটি গাড়ি ও ইউএনওর গাড়ি ভাঙচুর করে আস্তানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় নুরাল পাগলার অনুসারী ও উত্তেজিত জনতার ইট, পাথর নিক্ষেপে অন্তত ৫০ জন আহত হন। আহতদের গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাদের ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। তাদের মধ্যে দেবগ্রাম ইউনিয়ন পূর্ব তেনাপঁচা জুট মিস্ত্রিপাড়ার মোঃ আজাদ মেম্বারের ছেলে রাশেল মোল্লা (২৮) ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার চাচাতো ভাই ছাত্রদল নেতা শাহারিয়ার আদনান নুর ইসলাম।
এদিকে এ ঘটনায় রাজবাড়ী, বালিয়াকান্দি,
পাংশা, কালুখালী উপজেলাতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ‘তৌহিদি জনতা’। এর আগে সকালে নুরাল পাগলার পরিবারের পক্ষে গোয়ালন্দ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
গত ২৩ আগস্ট নুরাল পাগলার মৃত্যুর পর তার পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে তার নিজ বাড়ির সামনের অংশে দোতলা সমান (প্রায় ১২ ফুট উঁচু) একটি কাঠামোর ভেতরে কবরস্থ করা হয়। পরে কবরের পাশে ‘হযরত ইমাম মাহাদি (আ.) দরবার শরিফ’ লেখা ব্যানার টাঙানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গোয়ালন্দ উপজেলার ইমাম পরিষদ ও তৌহিদি জনতা গত ২৬ আগস্ট বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একাধিকবার মতবিনিময় সভা করা হয়।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ নাহিদুর রহমান বলেন, এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। তার গাড়ি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ও থানার ওসির গাড়ি ভাঙচুর করেছে জনতা। পরে নুরাল পাগলার আস্তানায় হামলা চালিয়েছে। তার মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দিয়েছে। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি এখন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রাজবাড়ী সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাসুদ বলেন, হাসপাতালে ২২ জন ভর্তি ছিল। সবাইকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। পুলিশ রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের নিন্দা
এদিকে রাজবাড়ীতে নুরা পাগলার কবর অবমাননা ও মরদেহে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে শুক্রবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই নিন্দা জানানো হয়। বিবৃতিতে সরকার বলেছে, এই অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজটি আমাদের মূল্যবোধ, আইন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য সমাজের মৌলিক ভিত্তির ওপর সরাসরি আঘাত। এ ধরনের বর্বরতা কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না। আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এবং প্রতিটি মানুষের জীবনের পবিত্রতা, জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরও রক্ষা করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। যারা এই ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘৃণা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে দেশের নাগরিকদের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হতে এবং ন্যায়বিচার ও মানবতার আদর্শকে সমুন্নত রাখতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত চায় এনসিপি,
এদিকে মাজার ভাঙচুর ও লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে এনসিপি। শুক্রবার এক বিবৃতিতে দলটি জানায়, এ ধরনের বর্বর ঘটনা শুধু ফৌজদারি অপরাধই নয়, বরং আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থি। এই মব-সন্ত্রাসের বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং জড়িতদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে এনসিপি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সকলে ঐক্যবদ্ধ হোন এবং ন্যায়বিচার ও মানবতার আদর্শকে সমুন্নত রাখতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা গড়ে তুলুন।’








