রুশাইদ আহমেদঃ
সমাজবদ্ধ রাজনৈতিক জীব হিসেবে জন্মের পর থেকেই মানুষ যোগাযোগ করতে শুরু করে। তাই অপত্যের কান্না শুনে অভিভাবকরা যেমন ধারণা করতে পারেন— সে কী চায়। তেমনি একটি জনসভায় বক্তা তার বক্তব্যে কী বুঝাতে চান, তা সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বুঝে নেন শ্রোতারা। শত শত বছর ধরে এভাবেই মনুষ্য প্রজাতি গড়ে তুলেছে সমাজের ভিত্তি।
আর এই ভিত্তি গড়তে গিয়ে যোগাযোগের সময় মানুষকে করতে হয়েছে বাচনিক ও অবাচনিক মাধ্যমের সফল ব্যবহার। কেননা, কার্যকরভাবে বার্তা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প নেই। তারই সূত্র ধরে আদিমকালের গুহালিপির নানা অস্পষ্ট প্রতীক থেকে শুরু করে বর্তমানে বিশ্বে কয়েক শতাধিক ভাষা ব্যবহার করে অনবরত যোগাযোগ করে যাচ্ছে আধুনিক মানুষ।
তবে সেই প্রতীকের মতো মাধ্যম ব্যবহার করে যোগাযোগ করা যে আমরা ছেড়ে দিয়েছি, তা নয়। বরং ডিজিটাল মাধ্যম তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টেক্সটের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করা হোক, কিংবা কোনো পোস্টে মন্তব্য করা— সর্বত্রই আমরা এখন ব্যবহার করছি হরেক রকমের ইমোজি। কিন্তু আধুনিকতার উৎকর্ষের যুগে এসে এই প্রতীকের মতো ইমোজি বা ইমোটিকন ব্যবহার করে আমরা কতটা কার্যকরভাবে যোগাযোগ করছি একে অপরের সঙ্গে? এই উত্তর খুঁজতেই এই সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ।
ইমোজির সূত্রপাত যেভাবে
‘ইমোজি’ মূলত একটি জাপানি শব্দ। আক্ষরিক অর্থে এর মানে চিত্রলিপি। অনেকে একে ভাবলিপিও বলে থাকেন। ১৯৯৮ সালে জাপানি মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান এনটিটি ডোকোমো-এর আই-মোবাইল ইন্টারনেট (আই-মোব) প্ল্যাটফর্মের সদস্য শিগেতাকা কুরিতা আবহাওয়ার কিছু সংকেত এবং মহাসড়কের কিছু নির্দেশক প্রতীককে ইমোজিতে রূপান্তর করেন। এর মধ্য দিয়েই সূত্রপাত ঘটে ইমোজির।
কুরিতা মানুষের মৌখিক অভিব্যক্তি বা ভঙ্গিমা এবং শহরের বিবিধ বস্তু পর্যবেক্ষণ করে সর্বমোট ১৮০টি ইমোজি তৈরি করেন। আই-মোব তাদের মেসেজিং পরিষেবার মাধ্যমে বৈদ্যুতিক যোগাযোগকে ত্বরান্বিত করার স্বার্থে সেগুলো হতে ১৭৬টি প্রতীক নির্বাচন করে ১২×১২ পিক্সেল আকারে ইমোজির প্রথম সেট প্রকাশ করে। তবে সেগুলোর ব্যবহার শুধু জাপানেই সীমাবদ্ধ ছিল, কারণ সেগুলোকে ইউনিকোডে ব্যবহার করা যেত না। পরবর্তীতে ২০১০ সাল নাগাদ ইমোজিগুলোকে ইউনিকোডভুক্ত করার মধ্য দিয়ে প্রতীকগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতীক দিয়েই অভিব্যক্তি প্রকাশ
শব্দ বা বাক্য লেখার বদলে প্রতীক দিয়েই মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশে সহায়তা করছে ইমোটিকন। এতে একদিকে যেমন মানুষ অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রে দ্রুততার ছাপ রাখতে পারছে, তেমনি শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করে বার্তা আদান-প্রদানে কিছুটা হলেও নিরুৎসাহিত হচ্ছে। যা মানুষের বাচনিক যোগাযোগ দক্ষতাকে নিম্নমুখী করে ফেলছে। যার ফলে বাস্তবজীবনে বিশেষত পেশাগত জীবনে মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
যোগাযোগ খাতে দুই যুগেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মার্কিন সোশ্যাল মিডিয়া কনসালটেন্ট এরিক হ্যানসন তাই এ দিকে আলোকপাত করে বলেছেন, নিজের ধ্যান-ধারণা লিখে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ পৃথক জিনিস। কারণ যাঁদের লেখনী দৃঢ়, যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁদের অগ্রগতিও সর্বাগ্রে।
ইমোজির দ্ব্যর্থতামূলক ভাব
বেশ কিছু ইমোজি দ্ব্যর্থতামূলক ভাব বহন করে থাকে। এ সকল প্রতীক একইসঙ্গে একাধিক অর্থ বহন করতে পারে। যা বার্তা গ্রাহকের মনে সংশয়ের জন্ম দেয়। ফলে তিনি বিভ্রান্ত হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ফিডব্যাক প্রদান করে যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে মূল্যহীন করে তুলতে পারেন।
উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, দুহাত এক করা ইমোজির কথা। অনেক সময় এটিকে ক্ষমা চাওয়া বা ধন্যবাদ জ্ঞাপনের প্রতীক মনে করা হলেও, হাই-ফাইভ কিংবা প্রার্থনা করার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার করে থাকেন অনেকে। তাই সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে এই দ্ব্যর্থতামূলক ইমোজির ব্যবহার বার্তা গ্রহণকারী অনুধাবনে ব্যর্থ হলে ঘটতে পারে দারুণ যোগাযোগ বিভ্রাট!
ইমোজির অপপ্রয়োগ
যত্রতত্র ভুল ইমোজির প্রয়োগও কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। অপ্রাসঙ্গিক ইমোজি ব্যবহারের ফলে যেমন বার্তা অডিয়েন্সের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে, একইভাবে পেশাগত যোগাযোগের সময় মাত্রাতিরিক্ত ইমোজির ব্যবহার যোগাযোগের উদ্দেশ্যকে গুরুত্বহীন করে তোলে।
ধরা যাক, এক ব্যক্তি কোনো এক খুশির সংবাদের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করার সময় ক্যাপশানের শেষে দিলেন ঘর্মাক্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখভঙ্গিমার ইমোজি। যা আদতে ব্যক্তির স্নায়বিক দৌর্বল্য বা নার্ভাসনেসের পরিচায়ক। কিন্তু খুশির সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে এ ধরনের ইমোজি কতটা জুতসই হতে পারে— সেই প্রশ্ন রয়েই যায়।
একইভাবে, একজন ব্যক্তি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দাপ্তরিক মেইল লেখার সময় যদি অহেতুক ইমোজির ব্যবহার করেন, তবে তা ওই ব্যক্তির পেশাদারিত্বের অবনমন ঘটায় বলে মনে করেন যোগাযোগ স্কলাররা।
তাহলে সমাধান?
ইমোজি মূলত দৈনন্দিন জীবনে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে হালকা মেজাজ বজায় রাখতে ব্যবহার করা হয়। তবে এর অপপ্রয়োগ এবং মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার যোগাযোগের উদ্দেশ্য এবং বার্তার গুরুত্বকে নিম্নগামী করে। তা ছাড়া, ইদানিং বাস্তবজীবনে আবেগের মাত্রারও এটি হ্রাস ঘটাচ্ছে। কারণ একজন ব্যক্তি যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্রন্দনরত মুখাবয়বের ইমোজি ব্যবহার করেন, তখন তার চোখ দিয়ে কি সত্যিই পানি বের হয়?
আবার, অনেক তরুণ-তরুণী মনে করেন, অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইমোজি ব্যবহার না করা ব্যক্তি রসকষহীন এবং যন্ত্রের সমান। কিন্তু আদতে এটাকে তাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। উপরন্তু, এ ধরনের ধারণা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
সার্বিকভাবে, কার্যকর যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে ইমোজি আমাদের কিছু কিছু স্থলে সহায়তা করলেও, এর অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রাসঙ্গিক ব্যবহার মিথস্ক্রিয়ায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা ভুল বুঝাবুঝির জন্ম দেয়। মূলত নির্দিষ্ট ইমোজি বা ইমোটিকনের সঠিক অর্থ অনুধাবনে ব্যর্থতাই এর কারণ। তাই সার্বিকভাবে, ইমোজিগুলোর সঠিক অর্থ ও ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞানলাভের পাশাপাশি যদি গণমাধ্যম সাক্ষরতার বিষয়ে জনমানুষকে সচেতন করে তোলা যায়, তবেই যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।






