মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী:
বিলুপ্তির পথ ধরেছে গ্রাম বাংলার চিরচেনা প্রাচীন কালের অন্যতম উপকারী উদ্ভিদ গাছ হিসাবে সবার কাছে পরিচিত “ভেন্না গাছ”। এক সময় বিশেষ করে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় পুকুরে, নদীর পাড়ে, বাড়ির আঙিনায় দেখা যেত ভেন্না গাছ। আর যেটা শুধু এখন প্রায় স্মৃতির পাতায় ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। প্রাচীন কালে গ্রামের মানুষেরা ভেন্নার ফল দিয়ে তৈল তৈরি করে সেটা খাবারের কাজে ব্যবহার করত। ভেন্না গাছ ১০ থেকে ১৫ হাত পর্যন্ত উঁচু হয়ে ফল দেওয়া শুরু করে মাঘ ও ফাল্গুন মাসে। ফলের গায়ে কাটার মত চিকন কাঁটা থাকে, ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকে। যখন ফলে পাঁক ধরে ফলের রং হয় তেতুলের বিচির মত। আর এসব ফল শুকানো হয় টানা রৈদ্রে। আগের যুগে সকালে গ্রামের নারীরা ঢেঁকি অথবা শক্ত কাঠ দ্বারা পিষে তৈল বের করতেন। এই তৈল সম্পূর্ন নির্ভেজাল ও বিষমুক্ত তৈল। বালিয়াকান্দি উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে চোঁখে পড়ে বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার চিরচেনা ভেন্না গাছ। যত সামান্য শুধুমাত্র চোঁখে পড়ছে যে গাছটি অযত্নে অবহেলায় সম্পূর্ণ বেড়ে ওঠে যদিও বাণিজ্যিকভাবে এই গাছের চাষ আমাদের এলাকায় করা হয় না।
হাঁটতে হাঁটতে কথা হয় আশিউদ্ধো বয়সি সকিনা বেগম নামের এক নারীর সাথে তিনি জানান, প্রাচীনকালে ভেন্নার বীজ দিয়ে তেল বের করে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হতো। বীজ রোদে শুকিয়ে শক্ত করে বেটে মিহি করে তেল বের করা হতো, সেই তেল রান্নার কাজে লাগাতো গ্রামীণ নারীরা। সেই তেলের সুঘ্রাণ ছিল অন্যরকম। ভেন্নার তেল দিয়ে তৈরি তরকারি মজা লাগতো তখন প্রায়ই আমরা ভেন্নার তেল ব্যবহার করে থাকতাম।
এ বিষয়ে কথা হয়েছিল শহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির সাথে তিনি জানালেন, এক সময় গ্রামের প্রতিটা পরিবারের লোকজনে রান্নার কাজে ব্যবহার করতো এই ভেন্নার তেল। এই তৈল ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না। এই তৈলে তারা পরিবারের সকল রান্নার কাজ চলাতো তারা ভেন্না গাছের বীজ রোদে শুকিয়ে তারপর বীজ গুলো চিকিয়ে শক্ত কাঠ বা ঢেঁকি দ্বারা পিষে তৈল বের করতো। রান্নায় ব্যবহারকৃত তরকারীতে সুঘ্রাণ ও সুস্বাদু ছিল। আধুনিকতার যুগে এখন আর ভেন্নার তেল দেখা যায় না। তিনি আরো জানান, গ্রাম বাংলার এক সময় রাস্তার ধারে বাড়ির পাশের বন জঙ্গলের পাশে পতিত জমিতে দেখা যেত এই ভেন্না গাছ। এখন আর তেমন একটা চোঁখে পড়ে না। এগুলো বাণিজ্যিকভাবে গ্রামের মানুষেরা চাষ করে না। ফলে ভেন্না গাছ লাগাতে পারলে আমাদের আর রান্নার তৈল পেতে কষ্ট হতো না।
বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের সারুটিয়া গ্রামের শ্রী অধির কুমার দাস জানালেন, প্রাচীন কালে গ্রাম অঞ্চলে প্রায় জায়গায় দেখা যেত এই চিরচেনা ভেন্না গাছ। গ্রামের বধুরা তখন ঐ ভেন্নার তেল রান্নার কাজে ব্যবহার করতো। তিনি আর ও জানালেন, বর্তমানে বনাঞ্চল বিলুপ্তির কারনে নানান গাছের সাথে এই চিরচেনা অতি প্রয়োজনীয় ভেন্না গাছ গুলো আজ বিলুপ্তির পথ ধরেছে। পুনারায় এটা আবার আগের দিনের মতো গোছাতে চাইলে অবশ্যই স্থানীয় পর্যায়ে বীজ বা চারা রোপন করতে হবে।
বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, পল্লীকবির বিখ্যাত আসমানী কবিতায় খোঁজ পাওয়া যায় গ্রামের এক অতি সাধারণ তেল ফসল ভেন্না/ক্যাস্টর যা থেকে উৎপাদন হয় বিভিন্ন গুনে গুণান্বিত ক্যাস্টর অয়েল। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ভোজ্য তেলের প্রতি মানুষের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই ভেন্না। অথচ ভেন্নাকে করা যেতে পারে এক সম্ভাবনাময় তেল ফসল হিসেবে। যাতে করে আমদানি নির্ভর তেলের চাহিদা অনেকাংশ পূরণ করা যেতে পারে।
প্রাচীন কালে গ্রাম অঞ্চলের পথের ধারে, পুকুর পাড়ে, নদীর কুলে, ঘরের পিছনে, বাড়ীর আঙ্গীনায় দেখা যেত তৈলজাত উদ্ভিদ সকলের চিরচেনা ভেন্না গাছ। কিন্তু এখন আর তেমন একটা চোঁখে পড়ে না এই গাছটি। তবে এই গাছের অনেক উপকারীতা রয়েছে। তাই গ্রামাঞ্চলের কেউ যদি বাণিজ্যিকভাবে ভেন্না চাষের উদ্দ্যোগ নেয়, তাহলে আমরা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সেই চাষিকে ভেন্না বীজ প্রদান করাসহ সার্বিক সহযোগিতা করবো। এবং সেই সাথে চাষিদের এই ভেন্না চাষের উপর প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহন করবো।










