বুধবার, ২৪শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি
বুধবার, ২৪শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

সিগারেট ও কবিতা– মেহেদী হাসান

আর.কে রোডের পূর্বদিকস্থে ইন্টারন্যাশনাল হসপিটালের অপজিটে মুহিনের এপার্টমেন্ট। পঞ্চম তালার বাসাটি হলদে রঙের ফেইরি বাল্বের আলোতে মেতে উঠেছে। লিভিং রুমটা গমগম করছে অতিথিতে। খাবারের আয়োজনটা প্রায় চুকে গেছে তৎক্ষনাৎ। পানীয়ের গ্লাস হাতে বসে পরেছে সবাই। কেউ হয়তো মেঝের উপর কুশল পেতে। গোড়াতেই ঈষৎ নাজেহাল অবস্থা আমার। বৈদেশিক কোনো পার্টি তো নয় বটে। বাঙালির পার্টি মানেই নারী পুরুষ অনেকটা ছানা কাটলেই যেমন ছানা আর জল আলাদা হয়ে যায়। তেমনি নারীরা একদিকে আর পুরুষরা অন্যদিকে। মুহিন চিমটি কাটলেন, টিপ্পনী ছাড়লেন না। তবে আমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার প্রশংসা না করে পারলাম না। তবুও আজ জলটাকে পুরোপুরিভাবে ছাড়তে পারেনি ছানা। এদিকে সেদিকে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ঘর জুড়ে। আমার পর্যবেক্ষণ খানিকটা নাকচ হয়েছে বুঝি।
অরেঞ্জ জুসের গ্লাস হাতে এদিক সেদিক একটা আলাদা ভাবমূর্তি নিয়ে ঘুরে এসে বসলাম একটা চারকোণা কেদারায়। হাত কয়েক পাশেই বসে আছেন যিনি , তাকে এর আগেও দেখেছি দু-একবার এরকম রমরমা পার্টিতে। তবে সেটা বহু বছর আগে। ছিপছিপে ফর্সা ও গায়ে হাতকাটা ব্লাউজ। পরনে শিফন শাড়ি। চুল বাধার স্টাইল বেশ নতুন ছক তৈরী করেছে৷ চিত্রশিল্পীর আঁকা কোনো অদ্ভুত সুন্দর নারীর ছবির মতো। ঠোঁটে গাঢ় স্যাঁতস্যাঁতে লাল লিপস্টিক। নখে লাল পলিশ। একটা হাতে একটি বেঁটে গ্লাসে পানীয় অন্য হাতে দুই আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেট। ঘরে অবস্থান অতিথিদের বেশ ক’জন ধুমপান করে চলেছেন।
মেয়েটির নাম তিথী। আমি বসে পরতেই স্মিত হেঁসে আলাপ জুড়ে দিলেন মেয়েটি। ভেবেছিলাম কথা বলার জন্য কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয় কি-না। আমার বাঙালীত্ব সম্বন্ধে মেয়েটির কোনো সন্দেহ নেই। এটা বুঝতে পেরেও বেশ আরাম লেগেছিল। হাতের কাছেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বইয়ের নাগাল পেতেই হাত বাড়িয়ে বই নিয়ে আড়চোখে ভদ্রমেয়েটার দিকে লুকোচুরি তাকালাম। তবে তিনি আমার এই লুকোচুরি তাকানোর ভঙ্গি ঠিকই বুঝতে পারলেন, এবং লজ্জিতবোধ হয়ে নড়েচড়ে বসলেন। পৃথিবীতে এত এত মানুষের ভাগ হয়ে যায় কেন? সেই বহুবছর আগে ভাগ হয়ে গেছে তারা। আবার যেতে ইচ্ছে করে তার খুব। এত এত মানুষের ভাগ হয় কেন?
নিজের আর অন্যের সিগারেটের ধোঁয়ায় মেয়েটার মুখটা আবছা হয়ে আসছে আমার চোখে। এরমধ্যে আরও ডজনখানেক মুখ কথা বলে যাচ্ছেন অবিরত এক সাথেই, ঘরের স্বপ্ল পরিসরে। মেয়েটার মুখনিঃসৃত বাক্যের অনেটাই শুনতে পাচ্ছি না স্পষ্টভাবে। অনেকটাই অনুমান নির্ভর হয়ে আলাপচারিতে আমার ভুমিকা। ডজন বাঙ্গালির মুখনিঃসৃত শব্দে অনুমান নির্ভর আলাপচারিতা ভয়াণক অনুশোচনার।
কথা বলেই চললেন মেয়েটি, শুরু করেন একটি কবিতা। হঠাৎ করেই শুরু। প্রথম পঙক্তির দুএকটি শব্দ কানে এলো। যেমন, “আমার একজন বন্ধু দরকার। বন্ধু!” । তার সাথে তাল মিলিয়ে মেয়েটার ফরসা আঙ্গুল একে একে ছুঁয়ে এলো দু’চোখের কোন দু’টিকে। পরক্ষণেই তাঁর প্রসারিত তর্জনী প্রাচীরের মত নেমে এলো তাঁর নাকের ওপরে লম্বালম্বি হয়ে। চোখ দুটো হয়ে ওঠে হঠাৎ উদ্বিগ্ন। একটু যতি। তার পর মেয়েটা দু’হাত বাড়িয়ে অদৃশ্য কিছু খুলে ফেললেন দ্রুত, অনেকটা দুয়ার খোলার মত। তর্জনীতে জাগে কিসের যেন ইঙ্গিত। আর সাথে সাথেই যেন তাঁর চোখে ফিরল এক স্বস্তি। কুড়ি সেকেন্ডে মেয়েটি এঁকে ফেললেন একটি কবিতার ছবি।
একটু পরেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পরলেন মেয়েটি, এবং অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের সাথে আলাপে ব্যস্ত থাকলেন, আমিও উঠে পরলাম এবং অন্য ব্যাক্তির সাথে আলাপচারিতায় অংশ নিলাম। রাত নেহাত বাড়তে থাকল। ঘরির দিকে তাকাতেই দেখলাম বারোটা বেজে গেছে।
আবার আর.কে রোডের পূর্বদিকস্থে ইন্টারন্যাশনাল হসপিটাল টপকে ড্রাইভ করে ফিরতে লাগলাম নিজের বাড়িতে। মাথায় তখনও ঘুরতে লাগলো মেয়েটার কবিতা আবৃত্তি। যে আবৃত্তির মাত্র কয়েকটি শব্দ আমি শুনতে পেয়েছি। কি কবিতার নাম? কে কবি? কথার ভিরে শুনতে পাই ইথার আক্তারুজ্জামান এর নাম একবার বুঝি। মাথার ভিতর একটি কবিতার লাইন বয়ে নিয়ে আর.কে রোড পেরিয়ে ঘরে ফিরি। বইয়ের ভীড় থেকে ইথার আক্তারুজ্জামান এর বই বের করি। পাতা উল্টাই, বেশিদূর যতে হলো না। এই সেই কবিতা। নিঃসন্দেহে এই সেই কবিতা৷ এই সেই ছবি…
আমার একজন বন্ধু দরকার, বন্ধু !!
যে বন্ধু উত্তাল সমুদ্রের অতল থেকে আমার
শেষ রাতের চাপা আর্তনাদের শব্দ শুনবে,
আমার বুকেতে মাথা রেখে আমার জীর্ণ মনের ক্ষুধা খুঁজবে,
প্রশান্তের নাবিক হয়ে আমায় বিশাল এ্যালবাট্রসের ছায়া ভেজাবে,
হ্যাঁ, আমার ঠিক সেই রকম একজন বন্ধু চাই, বন্ধু !

সম্পর্কিত