আজ ৩১শে আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৬ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ



রৌমারীতে বাল্য বিবাহ ও শিশু শ্রমের কারণে স্কুল ছেড়েছে ১৬৯৪ জন

জাহানুর রহমান খোকন, (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা:

বৈশ্বিক দুর্যোগ কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকায় কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায় বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের কারণে স্কুল ছেড়েছে প্রায় ১৩১৮ জন শিক্ষার্থী। এরমধ্যে বাল্য বিবাহের কারণে স্কুল ছেড়েছে ৩৭৬ জন এবং শিশুশ্রমসহ অন্যান্য কারণে স্কুলে আসা বন্ধ করেছে প্রায় ১৩১৮ জন শিক্ষার্থী।

উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মোঃ মুক্তারুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। গত দেড় বছরে রৌমারী উপজেলায় ৩৭৬ জন ছাত্রী বাল্য বিবাহ ও ১৩১৮ জন শিক্ষার্থী শিশুশ্রম সহ অন্যান্য কারণে স্কুল ছেড়েছেন। এর মধ্যে দাঁতভাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মোট ৪৪৫ জন ছাত্রীর মধ্যে বাল্য বিবাহের শিকার ৪৮ এবং ঝরে পড়েছে ৬২ জন, বকবান্দা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১১২জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বাল্য বিয়ের শিকার ৪ জন, ঝরে পড়ে ১০ জন শিক্ষার্থী, যাদুরচর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৪৩৮ জন, তারমধ্যে ২৬ জন বাল্য বিবাহের শিকার এবং ঝড়ে পড়েছে ৫০ জন শিক্ষার্থী। চরশৌলমারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৫৪১জন,

বাল্য বিবাহের শিকার ৬৮ জন এবং ঝড়ে পড়েছে ১০২জন শিক্ষার্থী। রৌমারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৬৫৫ জন, তারমধ্যে বাল্য বিবাহ শিকার ২৩ জন এবং ঝড়ে পড়েছে ৩০জন।

উপজেলা় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সুত্রে জানা যায়, রৌমারী উপজেলায় ৩০টি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৫,৫৭৩ জন, তারমধ্যে ঝড়ে পড়েছে ৮৯৫ জন এবং বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছেন মোট ৩০১ জন শিক্ষার্থী। এছাড়া উপজেলায় মোট দাখিল মাদ্রাসার সংখ্যা ১৪টি এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩২৭৭ জনের মধ্যে ঝড়ে পড়েছে ৪২৩ জন এবং বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছেন ৭৫ জন শিক্ষার্থী। যা মোট শিক্ষার্থীর ৫১% ছেলে ও ৪৯% মেয়ে।

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিয়ে হওয়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম। বিয়ের পর বেশিরভাগ ছেলের পরিবার আপত্তি করে মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে, তাই আর তাদের বিদ্যালয়ে ফেরা হয় না।
যাদুরচর গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণির এক ছাত্রীর বাবার সাথে কথা বলে জানা যায়, গত মার্চ মাসে তিনি তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। মেয়ের পড়াশোনার কি হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার জামাই চায় না মেয়ে আরও পড়াশোনা করুক তাকে ঢাকায় নিয়ে যাবে।

রৌমারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিউলী আক্তার এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, ”অভিভাবকদের মাঝে এখনো সচেতনতা অভাব রয়েছে,তারা মেয়েকে বোঝা মনে করেন। অভিভাবকরা গোপনীয়ভাবে তাদের মেয়েদের বিয়ে দেয়। বেশিরভাগ সময় বিয়ে হওয়ার পর তারা খবর পান, তখন আর করার কিছুই থাকে না। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম ফিলাপ এবং অ্যাসাইনমেন্ট জমা না দেওয়া ছাত্রীদের খোঁজ করতে থাকলে আমরা তাদের পরিবারের মাধ্যমে জানতে পারি তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা আর স্কুলে ফিরবে না।”

জাল হাতে মাছ ধরতে যাচ্ছে শিশু। ছবিঃ উত্তরবঙ্গের সংবাদ

উপজেলার দাঁতভাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ”গত ১২ সেপ্টেম্বর সরকারি সিদ্ধান্তে স্কুল খোলার পর বিভিন্ন শ্রেণির বেশকিছু ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসে অনুপস্থিত ছিলো। প্রথমদিকে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিলাম কিন্তু পরে বেশ কয়েকদিন নিয়মিত অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের বিষয়ে খোঁজ করে জানতে পারি স্কুলের ৪৮ জন ছাত্রীর বাল্য বিয়ে হয়েছে।”
গলগ্রাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেনীর শিক্ষার্থী আতিকুল ইসলাম করোনা মহামারীর প্রায় ৬ মাস পর বইপত্র গুছিয়ে রেখে ইঞ্জিন চালিত ভ্যান রিকশার হাতল ধরেন।
আতিকুল জানায়, ”পরিবারে ৬ জন সদস্য, বাবার একার আয়ে সংসার চলছিল না। লকডাউনে বাবা রিক্সা নিয়ে বাইরে যেতে পারছিলেন না। কিস্তির মাস্টার টাকার জন্য চাপ দিতে থাকলে আমি ভ্যান নিয়ে বেড়িয়ে পরি। আমি বয়সে ছোট হওয়ায় লকডাউনে পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হতো না। শুরু হলো ভ্যান চালানো। এখন আমি নিয়মিত ভ্যান চালিয়ে পরিবারের খরচ চালাই। স্কুল খুলেছে কিন্তু আমার আর স্কুলে যাওয়া হবে না।”
উপজেলার সিজি জামান সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু হোরায়রা শুধুমাত্র অভিভাবকদের অসচেতনতার জন্য বাল্য বিবাহ ও শিশুশ্রমে যুক্ত হয়ে বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ”দারিদ্রতা, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের ইচ্ছা এবং বখাটেপনার কারণে বাল্যবিবাহ হরহামেশাই ঘটে থাকে। তবে শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়া ও শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ার প্রধান কারণ দারিদ্র্যতা।”

সরকারের কঠোর বিধিনিষেধ এর কারণে আইনগত ভাবে বাল্য বিয়ে নিবন্ধন করা জটিল। তাই অনেক অভিভাবক ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এবং গোপনীয় ভাবে বিয়ে নিবন্ধন করে থাকেন।
রৌমারী উপজেলায় সরকারি ভাবে নিযুক্ত কাজী মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, ”আমি রৌমারী সদর ইউনিয়নের কাজী, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিয়ে কাবিন রেজিস্ট্রেশন করে থাকি, ভোটার আইডি কার্ড ও জন্মসনদ অনুযায়ী রেজিঃ করি, আমি বাল্য বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করি না। কিছু অভিভাবক ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ছেলে/মেয়েকে অন্যত্র নিয়ে অনিবন্ধিত কাজীর মাধ্যমে বাল্য বিবাহের কাজটি সেরে নেয়।”

রৌমারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আইয়ুব ইসলাম বলেন, ”বিষয়টি খুব হতাশার। সরকার যেখানে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে নারী শিক্ষা অগ্রসরের জন্য সেখানে অভিভাবকরা বাল্য বিয়ে দিচ্ছে পিতা হিসাবে তাদের দায়মুক্তির জন্য। তিনি আরও বলেন, শিগগির উপজেলার বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসা পরিদর্শন করে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

পরিবারের কর্মব্যস্ত সদস্যর জন্য মাথায় খাবার ও হাতে পানি নিয়ে যাচ্ছে শিশু। ছবি: উত্তরবঙ্গের সংবাদ

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আল ইমরান বলেন, ”সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের।করোনা সংক্রমণের কারণে নিয়মিত তদারকি করা পুরোটা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই গত দেড় বছরে বাল্য বিয়ে বেড়েছে কিছুটা। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান,জনপ্রতিনিধি, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে শিক্ষার্থী ঝড়ে পরা ও বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতা মূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে যাদের বিবাহ হয়েছে এবং যারা শিশুশ্রম সহ নানা কারণে বিদ্যালয় ছেড়েছে তাদের স্কুলে ফিরে আনা হবে।”



Comments are closed.

      আরও নিউজ

ফেসবুক পেইজ