আজ ১০ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ



প্রতিবন্ধী ও কন্যা সন্তান জন্মদানে স্বামীহারা এসমোতারা

জাহানুর রহমান খোকন, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: মেয়ে শিশু জন্মদান এখনও স্বাভাবিকভাবে নেয় না আমাদের সমাজ। শিশুর মায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নানা দুঃখজনক ঘটনার খবর মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়। প্রতিবন্ধী ও কন্যা সন্তান জন্মদানের কারণে স্বামীহারা হয়েছেন এক নারী। এই দুঃখজনক একটি ঘটনা ঘটেছে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারয়নপুর ইউনিয়নে।

অত্র ইউনিয়নের ডাক্তারপাড়ার মৃত ইছামুদ্দিনের মেয়ে এসমোতারার(২৭) সাথে সাত বছর আগে বিয়ে হয় ঢাকা কেরানীগঞ্জের আবুল হোসেনের(৫৮)। এসমোতারাকে বিয়ের পূর্বে আবুল হোসেন ঢাকায় একটি বিয়ে করেন, সেখানে তার পাঁচটি সন্তান রয়েছে। বাবাহারা এসমোতারাকে অভাবী সংসারে ভাইয়েরা বোঝা ভেবেই পাঁচ সন্তানের জনক আবুল হোসেনের সাথে বিয়ে দেন। বিয়ের পর ভালোই কাটছিল তাদের সংসারজীবন। এক বছরের মাথায় এসমোতারার কোলজুড়ে জন্মনেয় এক কন্যাশিশু(আছিয়া)। কন্যাসন্তান জন্মদানে বাবা আবুল হোসেন খুশি হতে পারেননি। স্ত্রীর উপর অভিমানে কাজকর্ম বন্ধ করে দেন। এসমোতারা অন্যের বাসায় কাজ করে স্বামী ও সন্তানের ভরণপোষণ করে আসছিলেন। তার দুই বছর পর এসমোতার দ্বিতীয় কন্যা সন্তান প্রসব করেন। জন্মের পর থেকে দ্বিতীয় সন্তান(আয়শা) অসুস্থ হলে নারায়নপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।মায়ের অপুষ্টির কারণে সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক। সন্তান জন্মের দেড় বছর পর যখন আবুল হোসেন বুঝতে পারেন তাদের দ্বিতীয় কন্যাসন্তান শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী, তখন তিনি এসমোতারার পেটে আসা তৃতীয় সন্তান নষ্ট করার পরামর্শ দেন। এসমোতারা স্বামীর এই প্রস্তাবে রাজী হননি। স্বামীর অমতে সন্তান ধারণ করার জন্য আবুল হোসেন এসমোতারাকে ছেড়ে প্রথম স্ত্রীর কাছে পাড়ি জমান। আবুল হোসেন চলে যাওয়ার কিছুদিন পর এসমোতারা এক পুত্র সন্তানের(ইউনুস) জন্মদেন।কিন্তু আবুল হোসেন সন্তান ও এসমোতারার কোন খোঁজখবর নেননি। দুই বছর ধরে মায়ের ভিটের পাশে প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে একটি ঝুপড়ি বাড়িতে চরম মানসিক ও আর্থিক কষ্টে দিন কাটছে এসমোতারার।
এক সময় অন্যের বাসায় কাজ করলেও প্রতিবন্ধী ও ছোট ছোট তিন ছেলে মেয়েকে রেখে এখন কাজে যেতে পারেন না। সন্তানের চিকিৎসার ও নিজের বাঁচার জন্য জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিত্তবানদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষাবৃত্তি করে চলে তার সংসার। প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য তার ভাগ্যে জোটেনি কোন ভাতা কার্ড।

এসমোতারা বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ও কন্যা সন্তান জন্মদানে আমি স্বামীহারা হয়েছি। অসুস্থ ও কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়া কি আমার অপরাধ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা মারা গেছেন।ভাইয়েরা আমার থেকে দ্বিগুণ বয়সী বুড়া মানুষের সাথে আমার বিয়ে দিলেন। কিন্তু সুখ পেলাম না।প্রতিবন্ধী ও কন্যাসন্তান জন্মদানের অপরাধে স্বামীকে হারালাম। কথা বলতে বলতে চোখ মুছেন এসমোতারা। চোখ মুছে বলেন, শুনেছি প্রতিবন্ধী শিশুকে সরকার থেকে সহযোগিতা করে, ভাতা দেয়। আমি কোন সুযোগ সুবিধা পাই না।’

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল বাশার জানায়, আবুল হোসেনের জন্মস্থান নারায়নপুর হলেও সে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জেলায় গিয়ে একাধিক বিয়ে করেছে। এসমোতারার পরিবারের অভাবের সুযোগ নিয়ে আবুল হোসেন তার মেয়ের বয়সী এসমোতারাকে বিয়ে করে। কন্যাসন্তান ও প্রতিবন্ধী সন্তান জন্মদানে ছেড়ে যাওয়াটা তার বাহানা মাত্র।

নারায়নপুর ইউপি চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বলেন, বছর দুয়েক আগে স্বামী স্ত্রীর মাঝে ভুল বুঝাবুঝি হওয়ায় আবুল হোসেন রাগ করে ঢাকা গেছে শুনেছি। তাদের ঘরে প্রতিবন্ধী শিশু আছে বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তাছাড়া এসমোতারা কোনদিন আমাদের কাছে প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য আসেনি। আমাদের কাছে আসলে আমরা তার ভাতা কার্ড করে দিবো।

নাগেশ্বরী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মোঃ সালেকুল ইসলাম বলেন, ‘নাগেশ্বরী উপজেলায় মোট ৬০০৯ জন সুবর্ণ নাগরিক সুবিধা পেয়ে আসছেন। তারমধ্যে প্রতিবন্ধী ৫৩২২ জন।নারায়নপুর ইউনিয়নে ২১৪ জন সুবর্ণ নাগরিক সুবিধা পাচ্ছেন। এরমধ্যে প্রতিবন্ধী ১৮৪ জন এবং আরো দুইজনের তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে। এতোজন মানুষের মধ্যে এই পরিবারটি কিভাবে বাদ গেল সেটা দুঃখজনক ঘটনা।’
এই কর্মকর্তা আরো জানান, এসমোতারা ও তার প্রতিবন্ধী শিশুর কথা বিশেষ বিবেচনায় রেখে আমরা এই সপ্তাহের মধ্যেই তার সুবর্ণ নাগরিক কার্ড করে দিবো।



Comments are closed.

      আরও নিউজ

ফেসবুক পেইজ