আজ ১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৩০শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ



নিরাপদ স্থানের খোঁজে বানভাসী মানুষ

জাহানুর রহমান খোকন, কুড়িগ্রাম:
টানা কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রাম জেলার সকল নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে জেলায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পরেছে। গবাদিপশু, নারী ও শিশু নিয়ে চরম কষ্টে দিনযাপন করছেন বানভাসী মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে পানি ওঠায় বন্ধ হয়েছে পাঠদান কার্যক্রম।

নিরাপদ ঠাঁই সন্ধানে বানভাসী মানুষ:
জেলার অনেক চরাঞ্চলের বসতভিটা ৪ দিন আগে পানিতে ডুবে গেছে। রান্না করার কোন ব্যবস্থা না থাকায় শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে অনাহারে অধ্যাহারে দিনাতিপাত করছে চরাঞ্চলের বাসীন্দারা। এসব চরাঞ্চলের বানভাসী মানুষের অনেকেই ইতোপূর্বে গলা পানিতে ডুবে থাকা বসত বাড়ি রেখে পাড়ি জমাচ্ছে পাশ্ববর্তী চরে। কেউ কেউ ডাঙ্গায় আত্নীয় স্বজনের বাসায় আশ্রয় নিচ্ছেন।
যাত্রাপুর ইউনিয়নের পোড়ারচরে গিয়ে দেখা যায় ডুবন্ত ঘরের আসবাবপত্র ও গবাদিপশু নৌকায় তুলতে। পোড়ারচরের বাসিন্দা আয়না বেগম(২৫) কে দেখা যায় সাঁতার পানিতে ভেসে ভেসে ডুবন্ত ঘরের ভিতর থেকে ভেসে যাওয়া খড়ি ও আসবাবপত্র নৌকায় তুলতে। নৌকায় দুই শিশু সন্তানকে আগলে রাখছেন আয়না বেগমের মা। কেউ কেউ স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া ঘর নৌকায় করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আয়না বেগমের সাথে কথা বলে জানা যায়,
তারা নৌকাতে মালামাল তুলে তারা আত্মীয় বাড়ি ঠাঁই নিতে যাচ্ছে। আয়না বেগম জানায়, ছোট ছোট সন্তান নিয়ে রাতে নৌকায় রাত কাটানো যায় না। বৃষ্টি তে নিজে কষ্টে থাকা গেলেও সন্তানদের ঠান্ডা লাগে। তার উপরে সাপের ভয়।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, যাত্রাপুর ইউনিয়নের প্রায় সকল চরাঞ্চলের মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।

কোলের শিশুকে নৌকায় রেখে ভেসে যাওয়া আসবাবপত্র সংগ্রহ করছেন বানভাসী নারী। ছবিঃ উত্তরবঙ্গের সংবাদ

স্থগিত পাঠদান কার্যক্রম:
বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ঝুঁকি থাকায় বন্যাকবলিত স্থানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে পাঠদান কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শাহীদুল ইসলাম জানান, রৌমারী এবং কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা মিলে মোট ৫৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় সংখ্যা বাড়তে পারেও বলে জানান তিনি।
অপরদিকে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শামসুল আলম জানান, এখন পর্যন্ত কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধের খবর পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ভোগান্তির খবর পাওয়া গেছে। বন্যার কারনে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সংখ্যাও কমে গেছে বলে জানান তিনি।

 

উপজেলায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; জেলা প্রশাসন:
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ উপজেলাগুলোতে ত্রাণ, নগদ অর্থ এবং চাল বরাদ্দ দিয়েছে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, ইতোমধ্যেই আট হাজার পরিবারের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানো হয়েছে। রৌমারীতে  ২০০ প্যাকেট ত্রাণ, আড়াই লক্ষ টাকা, ১০ মে.টন চল; রাজিবপুর উপজেলায় ২০০ প্যাকেট ত্রাণ, এক লক্ষ টাকা, ১০ মে.টন চল; রাজারহাট উপজেলায়   লক্ষ টাকা, ১০ মে.টন চল সহ প্রায় সকল ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে আজকে ত্রাণ বিতরণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

গবাদিপশু নিয়ে ঘর ছাড়ছে বানভাসী মানুষ

কুড়িগ্রাম-রমনা রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ:
ভারী বর্ষণে কুড়িগ্রাম-রমনা (চিলমারী) রেলপথের কাছাকাছি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ওই রেলপথে রমনা কমিউটার ট্রেন চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলপথ কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার (১৭ জুন) থেকে ওই রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন কুড়িগ্রাম রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার সামসুজ্জোহা।
স্টেশন মাস্টার জানান, অতিবৃষ্টির কারণে কুড়িগ্রাম-রমনা রেলপথের কয়েকটি স্থানে রেলপথের পাশে পানি জমে থাকায় ওই রেলপথটি ট্রেন চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ওই রেলপথটি ট্রেন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ আপাতত কুড়িগ্রাম-চিলমারী রুটে রমনা কমিউটার ট্রেন চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ওই রেলপথে ট্রেন চলেছে। তবে ট্রেনটি ‍পূর্ব নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী কুড়িগ্রাম রেল স্টেশন থেকে রংপুর ও লালমনিরহাট রুটে চলাচল করবে।

বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত:
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবোর) সূত্রে জানা যায়, উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে ধরলার পানি কুড়িগ্রাম সেতু পয়েন্টে ও তালুকসোনাইকাজী ফুলবাড়ি পয়েন্টে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার, দুধকুমারের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বিপদসীমার সামান্য নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।



Comments are closed.

      আরও নিউজ

ফেসবুক পেইজ