বৃহস্পতিবার, ২৩শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি
বৃহস্পতিবার, ২৩শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি

ইংরেজি শিক্ষক হামিদ মাস্টারের ঠাঁই হলো বৃদ্ধাশ্রমে

নিউজ ডেস্ক: বৃদ্ধ হামিদ মাস্টার। একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। অনেক ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছেন। গ্রামে জমি-বসতভিটাসহ শহরে ছিল দোতলা বাড়ি।

স্ত্রী ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সুখেই কাটছিল তার সংসার। হঠাৎ স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ছেলেকে বিয়ে করান। কিন্তু জমিজমাসহ শহরের দোতলা বাড়ি একমাত্র ছেলে আলামিনের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার পরই বাড়ি ছাড়া হতে হয় হামিদ মাস্টারকে। ছেলে ও তার স্ত্রী মারধর করে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় তাকে। এরপর থেকেই হামিদ মাস্টারের ঠাঁই হয় মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রমে।

সম্প্রতি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে দেখা হয় হামিদ মাস্টারের সঙ্গে। জীবনের চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে অতীতের কথা মনে করে হামিদ মাস্টার ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নের চক বিরাহিমপুর গ্রামে। আমি এক হতভাগা বাবা। আমার একমাত্র ছেলে। আমি তাকে মুফতি করার আশায় বগুড়ার স্বনামধন্য জামিল মাদরাসায় ভর্তি করেছিলাম। ছেলের নাম রেখেছিলাম আলামিন (বিশ্বাসী)। সেখানে কিছুদিন পড়ার পর সবকিছু বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে ছেলে। বাড়িতে এসে বিভিন্ন অসৎ সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। কিছু দিনের মধ্যে আমার স্ত্রীও মারা যায়। এরপর ছেলেকে বিয়ে করাই। বিয়ের কিছুদিন পর আমার ছেলে ও তার স্ত্রী মিলে বিভিন্ন কৌশলে আমার কাছ থেকে ছয় বিঘা জমি, বাড়ি, শহরের দোতলা ভবন লিখে নেয়। লিখে নেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই ছেলে আর ভাত দেয় না। ছেলের বউ একাধিকবার আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। শত অপমান সহ্য করে বাড়িতে ফিরে গেলে একদিন আমাকে অনেক মারধর করে ছেলের বউ। পরে ছেলেও এসে আমার গলা টিপে ধরে হত্যা করার চেষ্টা করে। পরে আশপাশের লোকজন এসে আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। এরপর আর বাড়ি যাইনি। পরে লোকমুখে শুনে গোবিন্দগঞ্জের ছোট সোহাগী গ্রামের মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রমে আসি। সেই থেকে এখানেই আছি।

তিনি আরও বলেন, এই ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে জীবনের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছি। গোবিন্দগঞ্জের বিশুবাড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক ছিলাম। ২০১২ সালে অবসর গ্রহণের পর পেনশনের চার লাখ টাকা পাই। সেই চার লাখ টাকাও ছেলের কিডনির পাথরের অপারেশনে ব্যয় করেছি। এতকিছু করার পরও একমাত্র ছেলের সংসারে আমার ঠাঁই হলো না, এই দুঃখ আমি কোথায় রাখব।

মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রম ঘুরে দেখা গেছে, শুধু হামিদ মাস্টার নয় এই বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় হয়েছে অন্তত ৪৫ জন বৃদ্ধ মা-বাবার। সবারই জীবনের ট্র্যাজেডি অনেকটা হামিদ মাস্টারের মতো।

মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আপেল মাহমুদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বৃদ্ধ হামিদ মাস্টারের জীবনের কাহিনি অনেক করুণ। শিক্ষিত মানুষ। উনার সমস্ত সম্পদ ছেলে লিখে নিয়ে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। এত কষ্ট নিয়ে এখনো যে সুস্থ আছে এটা বিশাল ব্যাপার।

তিনি আরও বলেন, আমাদের এই বৃদ্ধাশ্রমে ৪৫ জন বৃদ্ধ বাবা-মা আছে। প্রত্যেকের জীবনে কিছু না কিছু ট্র্যাজেডি রয়েছে। এখানে প্রতিবন্ধী, প্যারালাইজডসহ বিভিন্ন রোগে-শোকে আক্রান্ত বাবা-মা রয়েছেন। যাদের তিনবেলার খাবার, চিকিৎসাসহ যাবতীয় খরচ এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হচ্ছে। এখানে আমরা কোনো সরকারি অনুদান পাই না। এই রমজান মাসে আমাদের অনেক সংকট।

বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসহ সমাজের বিত্তবান মানুষদের অসুস্থ মা-বাবাদের পাশে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। সূত্র: ঢাকা পোস্ট

সম্পর্কিত